ট্রাম্পের ঘোষণার পর প্রথমবার ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলার খবর নেই, তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে আক্রমণ অব্যাহত
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র পর প্রথমবার ইউক্রেনের কোনও জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলার খবর পাওয়া গেল না। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবরের পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য। তবে তাতেই যুদ্ধের মেঘ কাটছে না। আগের রাতেও ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে পরিবহণ ও পণ্য সরবরাহের পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। অর্থাৎ, জ্বালানি স্থাপনায় আপাত বিরতি মিললেও যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার আক্রমণ থামেনি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দৈনিক সামরিক বিবৃতিতেও ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থায় হামলার কোনও উল্লেখ ছিল না। যুদ্ধবিরতি নিয়ে ক্রেমলিন জানিয়েছে, যোগাযোগ চলছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ শহরে উষ্ণতা সরবরাহকারী একটি কেন্দ্র থেকে এক কিলোমিটারের কিছু বেশি দূরে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে বলে খবর। ফলে জ্বালানি স্থাপনাগুলিকে সচেতনভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মঙ্গলবার দাবি করেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার পর দু’দিন ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা চালায়নি ইউক্রেন। তাঁর অভিযোগ, কিয়েভ সংযম দেখালেও মস্কোর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইউক্রেনের হামলা বন্ধ রাখার দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর রুশ কর্তৃপক্ষ বা সংবাদমাধ্যমেও শোধনাগারে নতুন ইউক্রেনীয় হামলার খবর প্রকাশিত হয়নি। জেলেনস্কির হিসাব অনুযায়ী, খারকিভে রুশ হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন এবং একই সন্ধ্যায় শহরটিতে ৪১ জন আহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণা, প্রশ্নে তার বাস্তবায়ন
রবিবার ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ঘোষণার পরই খারকিভের বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র এবং একটি অসামরিক জ্বালানি বিক্রয়কেন্দ্রে রুশ হামলার অভিযোগ ওঠে। ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
সোমবার ওয়ারশয় এক নিরাপত্তা সম্মেলনে জেলেনস্কি ওই হামলা নিয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে তিনি বলেন, জ্বালানি পরিকাঠামোয় পারস্পরিক হামলা বন্ধ রাখা যুদ্ধ শেষ করার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেই পথে এগোতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
নেপথ্যে ডিজেল, নিষেধাজ্ঞা ও ভোট
এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকার জ্বালানি বাজারের হিসাবও। শুক্রবার রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের পথ খুলতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রায় ২০ লক্ষ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য।
এদিকে, রুশ শোধনাগারে ইউক্রেনীয় হামলা বন্ধ না হলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি মার্কিন কর্মকর্তারা দিয়েছেন বলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নটি শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও।
কিয়েভে আগাম সতর্কতা নিয়েও উদ্বেগ
অন্য দিকে, কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে সতর্কবার্তা না পাওয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিনানশিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাতে রাজধানীতে পাঁচটি বিস্ফোরণের পর বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সহযোগী দেশগুলির কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। তবে কোন দেশের কথা তিনি বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি।
ঘটনাটি ইউক্রেনের সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, শুধু আগাম বার্তা না পাওয়ার ঘটনা থেকেই গোয়েন্দা সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
ইউরোপেরও ভরসা নেই
যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। সোমবার ইইউয়ের বিদেশনীতি প্রধান কাজা কালাস বলেন, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানালেও রাশিয়া সেই প্রতিশ্রুতি মেনে চলবে, এমন লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা বন্ধ হলেও অন্যত্র প্রাণঘাতী আক্রমণ চলতে থাকলে যুদ্ধবিরতির সুফল সীমিতই থাকবে।
ইউক্রেনের কাছে এই বিরতির গুরুত্ব যথেষ্ট। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা হলে ঘর গরম রাখা, পানীয় জল সরবরাহ এবং দৈনন্দিন পরিষেবা ব্যাহত হয়। শীত এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
তাই মঙ্গলবারের পরিস্থিতি সাময়িক আশার ইঙ্গিত দিলেও স্থায়ী স্বস্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার এই উদ্যোগ কত দিন টেকে, দুই পক্ষ কতটা সংযম দেখায় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আদৌ বাড়ে কি না—তার উপরেই নির্ভর করছে ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির সাফল্য।